
ব্রেকআপ (Breakup)—শব্দটা ছোট হলেও এর ভার বা ওজন অনেক বেশি। জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে আমরা অনেকেই এই তিক্ত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাই। বুকটা খালি হয়ে যাওয়া, গলায় দলা পাকিয়ে আসা কান্না, আর ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা—এই অনুভূতিগুলোর সাথে পরিচিত অনেকেই। মনে হয় যেন পৃথিবীটা পায়ের নিচ থেকে সরে যাচ্ছে।
কিন্তু সমস্যাটা শুধু ব্রেকআপ হওয়া নিয়ে নয়। সমস্যা হলো, ব্রেকআপের ঠিক পরেই আমরা এমন কিছু ভুল সিদ্ধান্ত নিই বা এমন কিছু কাজ করে ফেলি, যা আমাদের এই যন্ত্রণাকে কমানোর বদলে দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয়। আমরা ভাবি, এই কাজগুলো করলে হয়তো শান্তি পাবো বা প্রিয় মানুষটা ফিরে আসবে, কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। আবেগের বশবর্তী হয়ে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো আমাদের দীর্ঘমেয়াদী কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
অনেকেই বুঝতে পারেন না এই সময় ঠিক কোন পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বা কীভাবে নিজেকে সামলানো উচিত। আপনি যদি সদ্য ব্রেকআপের মধ্য দিয়ে যান এবং তাৎক্ষণিক করণীয় নিয়ে বিভ্রান্ত থাকেন, তবে আমাদের এই গাইডটি আপনার জন্য সহায়ক হতে পারে: ব্রেকআপের পর কি করবেন? নিজেকে সামলানোর পূর্ণাঙ্গ গাইডলাইন।
আজকের এই আর্টিকেলে আমরা আলোচনা করবো এমন ৭টি মারাত্মক ভুল নিয়ে, যা মানুষ ব্রেকআপের পর বারবার করে। এবং সবচেয়ে জরুরি—কীভাবে এই ভুলের ফাঁদ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবেন, তার স্টেপ-বাই-স্টেপ গাইড। আপনি যদি মনে করেন জীবনটা এখানেই শেষ, তবে এই লেখাটি আপনার ধারণা বদলে দেবে। চলুন, জীবনের এই কঠিন সময়টাকে সহজ করার উপায়গুলো বিস্তারিত জেনে নিই।
ব্রেকআপ আসলে কী? (মনস্তাত্ত্বিক সংজ্ঞা ও বিজ্ঞান)
সহজ কথায় ব্রেকআপ হলো একটি রোমান্টিক সম্পর্কের সমাপ্তি। কিন্তু মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, ব্রেকআপ অনেকটা ‘ড্রাগ উইথড্রয়াল’ (Drug Withdrawal)-এর মতো। শুনতে অবাক লাগলেও এটি বৈজ্ঞানিকভাবে সত্য।
সম্পর্কে থাকাকালীন আমাদের মস্তিষ্কে ডোপামিন (Dopamine) এবং অক্সিটোসিন (Oxytocin)-এর মতো ‘ফিল গুড’ হরমোন প্রচুর পরিমাণে নিঃসৃত হয়। এই হরমোনগুলো আমাদের খুশি রাখে। কিন্তু ব্রেকআপের পর হঠাৎ করে এই হরমোনের প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে আমাদের মস্তিষ্ক অস্থির হয়ে পড়ে এবং সেই পুরনো ‘সোর্স’ বা মানুষটাকেই পাগলের মতো খুঁজতে থাকে যেন সেই সুখের অনুভূতি আবার ফিরে পাওয়া যায়।
এই বায়োলজিক্যাল এবং সাইকোলজিক্যাল পরিবর্তনের কারণেই আমরা ব্রেকআপের পর লজিক্যাল বা যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নিতে পারি না। আমাদের বিচার-বুদ্ধি ঝাপসা হয়ে আসে এবং আমরা বারবার সেই মানুষটির কাছে ফিরে যেতে চাই, যা আমাদের জন্য ক্ষতিকর।
এই বিষয়গুলো জানা কেন জরুরি?
অনেকেই ভাবেন, “সময় সব ঠিক করে দেবে”। হ্যাঁ, সময় বড় ওঝা, কিন্তু আপনি যদি ভুল পথে হাঁটতে থাকেন, তবে সেই ক্ষত শুকাতে বছরের পর বছর সময় লেগে যেতে পারে।
- মানসিক শান্তি: সঠিক উপায় জানলে আপনি দ্রুত ডিপ্রেশন এবং এনজাইটি থেকে মুক্তি পাবেন।
- আত্মসম্মান রক্ষা: ভুল পদক্ষেপ, যেমন—পায়ে ধরে কান্না করা বা বারবার ফোন দেওয়া, আপনার আত্মসম্মান বা Self-respect ধূলিসাৎ করে দিতে পারে।
- ভবিষ্যৎ সম্পর্ক: এই সময়টা নিজেকে হিল (Heal) না করলে, আপনার পরবর্তী সম্পর্কও টক্সিক হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
বিস্তারিত গাইড: ব্রেকআপের পর যে ৭টি ভুল মানুষ বারবার করে (এবং সমাধান)
ব্রেকআপের পর ইমোশনাল ঝড় সামলানো কঠিন। নিচে ৭টি ভুলের বিস্তারিত আলোচনা এবং তা থেকে বের হওয়ার উপায় ধাপে ধাপে দেওয়া হলো:
১. এক্স-এর সাথে যোগাযোগ বজায় রাখার চেষ্টা করা (The Communication Trap)
ব্রেকআপের পর সবচেয়ে বড় এবং প্রথম ভুল হলো প্রাক্তন প্রেমিক বা প্রেমিকার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা। অনেকেই ভাবেন, “আমরা কি অন্তত বন্ধু হিসেবে থাকতে পারি না?” অথবা “শেষবারের মতো একবার কথা বলি।”
ভুলগুলো যেমন হয়:
- বারবার টেক্সট বা কল করা (বিশেষ করে রাত বিরেতে বা Drunk texting)।
- হুট করে তার অফিসের সামনে বা বাসার নিচে গিয়ে উপস্থিত হওয়া।
- কান্নাকাটি করে সম্পর্ক জোড়া লাগানোর অনুরোধ করা।
কেন এটি ক্ষতিকর: প্রতিবার আপনি যখন তার সাথে কথা বলেন, আপনার ব্রেন সেই পুরনো স্মৃতিগুলো রিফ্রেশ করে। এটি আপনার ক্ষতস্থানকে বারবার খুঁচিয়ে রক্তপাত করার মতো। এতে আপনার ‘মুভ অন’ (Move On) করার প্রক্রিয়া বারবার পিছিয়ে যায়। আপনি সেই লুপ বা চক্রের মধ্যেই আটকে থাকেন।
✅ বাঁচার উপায়: The No Contact Rule
আপনাকে কঠোরভাবে ‘No Contact Rule’ ফলো করতে হবে। এটি কোনো গেম বা কৌশল নয়, এটি আপনার সুস্থতার জন্য জরুরি।
- ৩০ থেকে ৯০ দিন: অন্তত এই সময়ের জন্য সব ধরণের যোগাযোগ (ফোন, মেসেজ, দেখা করা) সম্পূর্ণ বন্ধ রাখুন।
- নম্বর ডিলিট/ব্লক: প্রয়োজনে নম্বর ব্লক করুন বা ডিলিট করে দিন যাতে দুর্বল মুহূর্তে কল দিতে না পারেন।
- বন্ধুত্বের ফাঁদ: মনে রাখবেন, সদ্য ব্রেকআপের পর প্রাক্তনের সাথে বন্ধুত্ব সম্ভব নয়। নিজেকে হিল করার সময় দিন। ভবিষ্যতে বন্ধুত্ব হতেও পারে, কিন্তু এখন নয়।
২. সোশ্যাল মিডিয়ায় স্টক করা (Social Media Stalking)
আধুনিক যুগের ব্রেকআপের সবচেয়ে বড় অভিশাপ হলো সোশ্যাল মিডিয়া। ব্রেকআপের পর আমরা গোয়েন্দার মতো আচরণ শুরু করি। তার প্রোফাইল চেক করা এখন আমাদের নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়।
ভুলগুলো যেমন হয়:
- সে কার ছবিতে লাইক দিচ্ছে বা কমেন্ট করছে তা চেক করা।
- সে নতুন কোনো স্ট্যাটাস দিলো কিনা তা প্রতি ১০ মিনিট পর পর দেখা।
- ব্লক করে দেওয়ার পর ফেক আইডি খুলে তার স্টোরি বা পোস্ট দেখা।
কেন এটি ক্ষতিকর: মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় “Pain Shopping” বা নিজের টাকা খরচ করে কষ্ট কেনা। আপনি যখন দেখেন সে বন্ধুদের সাথে হাসছে বা ঘুরছে, তখন আপনার মনে হবে—”সে আমাকে ছাড়াই কত ভালো আছে!” অথচ সোশ্যাল মিডিয়া কখনোই পুরো বাস্তবতা দেখায় না। এটি আপনার হীনম্মন্যতা বাড়িয়ে দেয় এবং জেলাসি তৈরি করে।
✅ বাঁচার উপায়: ডিজিটাল ডিটক্স (Digital Detox)
- আনফ্রেন্ড/আনফলো: নির্দ্বিধায় তাকে আনফ্রেন্ড বা আনফলো করুন। এটি আপনার মানসিক শান্তির জন্য, শত্রুতার জন্য নয়।
- মিউট অপশন: যদি আনফ্রেন্ড করতে খুব খারাপ লাগে, তবে ‘Mute’ বা ‘Restricted’ অপশন ব্যবহার করুন যাতে তার আপডেট আপনার সামনে না আসে।
- সোশ্যাল মিডিয়া বিরতি: কিছুদিন সোশ্যাল মিডিয়া থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকুন। বই পড়ুন বা মুভি দেখুন।
৩. সম্পর্ককে অতিরিক্ত আদর্শায়িত করা (Idealizing the Relationship)
ব্রেকআপের পর আমাদের মস্তিষ্ক আমাদের সাথে এক অদ্ভুত খেলা খেলে। একে বলা হয় ‘Fading Affect Bias’। আমরা শুধু সম্পর্কের ভালো স্মৃতিগুলো মনে রাখি এবং খারাপ স্মৃতিগুলো ভুলে যাই বা ইগনোর করি।
আমরা ভাবতে থাকি, “ওর মতো কেউ আমাকে বুঝবে না” বা “আমাদের সম্পর্কটা পারফেক্ট ছিল।” কিন্তু বাস্তবতা হলো, সম্পর্কটা পারফেক্ট ছিল না বলেই আজ বিচ্ছেদ হয়েছে। হয়তো সেই সম্পর্কটিতে অনেক বিষাক্ত বিষয় ছিল যা আপনি এখন দেখতে পাচ্ছেন না।
আপনার সম্পর্কটি কি আসলেই ভালো ছিল, নাকি সেখানে টক্সিক কিছু ছিল যা আপনি এড়িয়ে গেছেন? মিলিয়ে নিন এখানে: টক্সিক রিলেশনশিপ এর লক্ষণ, কারণ ও মুক্তি পাওয়ার উপায়।
✅ বাঁচার উপায়: রিয়েলিটি চেক (Reality Check)
- নেগেটিভ লিস্ট তৈরি করুন: একটি ডায়েরি নিন। সেখানে সম্পর্কের সব খারাপ দিকগুলো লিখুন। কখন সে আপনাকে কষ্ট দিয়েছে, কোন বিষয়গুলো আপনার ভালো লাগত না, কোথায় আপনাদের মতের অমিল ছিল—সব লিখুন।
- লজিক্যাল হোন: এই লিস্টটি প্রতিদিন একবার করে পড়ুন। এটি আপনাকে মনে করিয়ে দেবে কেন আপনারা আলাদা হয়েছেন এবং কেন এটিই সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল।
৪. আবেগকে দমন করা বা ‘স্ট্রং’ সাজার ভান করা (Suppressing Emotions)
অনেকেই ভাবেন, কান্না করা দুর্বলতার লক্ষণ। তাই তারা নিজের কষ্টকে ভেতরে চেপে রেখে সবার সামনে হাসিখুশি থাকার চেষ্টা করেন। তারা নিজেদের বোঝান, “আমার কিছু যায় আসে না।”
কেন এটি ক্ষতিকর: আবেগ অনেকটা স্প্রিং-এর মতো। আপনি যত চেপে ধরবেন, এটি পরে তত দ্বিগুণ শক্তিতে বিস্ফোরিত হবে। অবদমিত আবেগ শারীরিক অসুস্থতা, উচ্চ রক্তচাপ, অনিদ্রা এবং দীর্ঘস্থায়ী ডিপ্রেশনের কারণ হতে পারে।
✅ বাঁচার উপায়: Feel it to Heal it
- কান্না করুন: কাঁদলে শরীরের টক্সিন বের হয়ে যায় এবং মন হালকা হয়। এটি হিলিং-এর প্রথম ধাপ। নিজেকে কাঁদার অনুমতি দিন।
- বিশ্বস্ত কারো সাথে কথা বলুন: এমন কোনো বন্ধু বা কাজিন, যে আপনাকে জাজ করবে না, তার সাথে মন খুলে কথা বলুন। শেয়ার করলে কষ্ট কমে।
- জার্নালিং: আপনার মনের সব রাগ, ক্ষোভ, অভিমান কাগজে লিখে ফেলুন। লেখা শেষে কাগজটি ছিঁড়ে ফেলুন বা পুড়িয়ে দিন—এটি এক ধরণের মুক্তির অনুভূতি দেয়।
৫. রিবাউন্ড রিলেশনশিপে জড়িয়ে পড়া (Rebound Relationships)
“লোহা দিয়ে লোহা কাটা”—এই প্রবাদটি সম্পর্কের ক্ষেত্রে খাটাতে যাওয়া বোকামি। একাকিত্ব কাটাতে হুট করে নতুন সম্পর্কে জড়ানো একটি বড় ভুল। একে বলা হয় Rebound Relationship।
অনেকেই এক্স-কে জেলাস ফিল করানোর জন্য বা নিজের শূন্যতা পূরণ করার জন্য বাছবিচার না করে নতুন কারো সাথে ডেটিং শুরু করেন। কিন্তু আপনি এখনো আগের সম্পর্কের ট্রমা থেকে বের হতে পারেননি। এই অবস্থায় নতুন সম্পর্ক কখনোই সুস্থ হতে পারে না। আপনি নতুন মানুষটির মাঝেও এক্স-কে খুঁজবেন, তুলনা করবেন, যা ওই নতুন মানুষটির প্রতি চরম অবিচার।
ভবিষ্যতে একটি সুস্থ সম্পর্ক গড়তে হলে আপনাকে আগে নিজেকে তৈরি করতে হবে। সম্পর্ক কীভাবে গভীর এবং অর্থবহ করা যায়, তা আগে থেকেই জেনে রাখা ভালো। পড়তে পারেন: সম্পর্ক গভীর করার উপায় ও টিপস।
✅ বাঁচার উপায়: নিজের সাথে প্রেম (Self-Love)
- সিঙ্গেল লাইফ এনজয় করুন: অন্তত ৬ মাস থেকে ১ বছর নিজেকে সময় দিন। একা থাকা শিখুন।
- ডেটিং নয়, হিলিং: এখন আপনার ফোকাস হওয়া উচিত নিজের ক্যারিয়ার, পড়াশোনা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে। অন্য কোনো মানুষের কাঁধে ভর করে ভালো থাকার চেষ্টা করবেন না।
৬. নিজেকে ভিকটিম ভাবা বা প্রতিশোধ নেওয়ার চিন্তা (Playing Victim)
অনেকে ব্রেকআপের পর নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় ব্যক্তি ভাবেন। “আমার সাথেই কেন এমন হলো?”, “আমি তো কোনো ভুল করিনি”—এই চিন্তায় ডুবে থাকা আপনাকে সামনে এগোতে দেয় না। আবার অনেকে এক্স-এর ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার ফ্যান্টাসিতে ভোগেন, যা আরও ধ্বংসাত্মক।
এই ধরণের নেগেটিভ চিন্তাভাবনা আপনাকে ডিপ্রেশনের গর্তে ঠেলে দেয়। এই সময় নিজেকে মানসিকভাবে চাঙ্গা রাখা খুব চ্যালেঞ্জিং হলেও অসম্ভব নয়। নিজেকে মোটিভেট রাখতে আমাদের এই গাইডটি দেখতে পারেন: নিজেকে মোটিভেট রাখার ১০টি কার্যকরী উপায়।
✅ বাঁচার উপায়: ক্ষমা এবং মুক্তি (Forgiveness)
- দায়িত্ব নিন: নিজেকে ভিকটিম না ভেবে পরিস্থিতির দায়িত্ব নিন। ভাবুন, “সম্পর্ক শেষ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু আমার জীবন শেষ হয়নি।”
- ক্ষমা করে দিন: তাকে ক্ষমা করা মানে তার কাজকে সমর্থন করা নয়, বরং নিজেকে সেই ক্ষোভ বা ঘৃণা থেকে মুক্তি দেওয়া। ঘৃণার বোঝা বয়ে বেড়ানো খুব ক্লান্তিকর।
৭. মাদক বা নেশার আশ্রয় নেওয়া (Substance Abuse)
ক্ষণিকের স্বস্তির জন্য অনেকেই অ্যালকোহল, সিগারেট বা ঘুমের ওষুধের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। কেউ কেউ আবার অতিরিক্ত জাঙ্ক ফুড (Comfort food) খেয়ে ওজন বাড়িয়ে ফেলেন।
কেন এটি ক্ষতিকর: নেশা আপনাকে সাময়িক ভুলিয়ে রাখলেও, নেশা কেটে গেলে ডিপ্রেশন আরও ভয়াবহ আকারে ফিরে আসে। এটি আপনার শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের অপূরণীয় ক্ষতি করে এবং আপনার রিকভারি প্রসেসকে ধীর করে দেয়।
✅ বাঁচার উপায়: স্বাস্থ্যকর অভ্যাস
- ব্যায়াম: প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট ব্যায়াম করুন বা হাঁটুন। ব্যায়াম করলে শরীরে ‘এন্ডোরফিন’ হরমোন রিলিজ হয় যা প্রাকৃতিক পেইনকিলার এবং মুড বুস্টার হিসেবে কাজ করে। (Source: Healthline Benefits of Exercise)
- নতুন স্কিল: রান্না শেখা, গান শেখা বা নতুন কোনো ভাষা শেখার চেষ্টা করুন। এটি আপনার ফোকাস নেগেটিভ চিন্তা থেকে সরিয়ে পজিটিভ দিকে নিয়ে যাবে।
Expert Tips: দ্রুত রিকভার করার ৩টি সিক্রেট টিপস
একজন রিলেশনশিপ এক্সপার্ট হিসেবে আমি আপনাকে কিছু বিশেষ টিপস দিতে চাই যা আপনার হিলিং প্রসেসকে ১০ গুণ দ্রুত করবে:
- রুটিন পরিবর্তন করুন: যে রাস্তা দিয়ে তার সাথে হাঁটতেন, যে রেস্টুরেন্টে যেতেন—সেগুলো কিছুদিন এড়িয়ে চলুন। নতুন রুটিন তৈরি করুন। মস্তিষ্ক যখন নতুন পরিবেশে থাকে, তখন সে পুরনো স্মৃতি কম মনে করে এবং নতুন স্মৃতি তৈরিতে ব্যস্ত থাকে।
- রুম রি-ডেকোরেট করুন: আপনার শোবার ঘরের আসবাবপত্রের অবস্থান পরিবর্তন করুন। বিছানার চাদর, পর্দা পরিবর্তন করুন। পরিবেশের পরিবর্তন আপনার মানসিকতা পরিবর্তনে জাদুর মতো কাজ করে।
- প্রফেশনাল হেল্প: যদি ৬ মাসের বেশি সময় ধরে আপনি স্বাভাবিক হতে না পারেন, ঘুমের সমস্যা হয় বা আত্মহত্যার চিন্তা আসে, তবে দেরি না করে অবশ্যই একজন সাইকোলজিস্ট বা কাউন্সেলরের পরামর্শ নিন। এটি কোনো লজ্জার বিষয় নয়। (Source: Psychology Today)
Case Study: সুমনের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প

উদাহরণ দিয়ে বোঝালে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে। ধরা যাক সুমন (ছদ্মনাম), একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি করেন। ৫ বছরের সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর তিনি নিজেকে ঘরবন্দী করে ফেলেন। অফিসে যাওয়া বন্ধ করে দেন এবং সারাদিন এক্স-এর প্রোফাইল চেক করতেন। এক পর্যায়ে তার পারফর্মেন্স খারাপ হওয়ায় চাকরি যাওয়ার উপক্রম হয়।
তখন সুমন বুঝতে পারেন, তিনি ভুল করছেন। তিনি যা করলেন:
- সোশ্যাল মিডিয়া থেকে ৩ মাসের ব্রেক নিলেন (Digital Detox)।
- জিমে ভর্তি হলেন এবং নিজের স্বাস্থ্যের দিকে নজর দিলেন।
- অফিসের কাজে পুনরায় মনোযোগ দিলেন এবং নতুন একটি প্রজেক্টে লিড দিলেন।
আজ ২ বছর পর সুমন বলেন, “ওই ব্রেকআপটা না হলে আমি জানতামই না আমার ভেতর কতটা শক্তি লুকিয়ে আছে। আমি আজ ক্যারিয়ারের যে অবস্থানে আছি, তা হয়তো ওই ধাক্কাটা না খেলে সম্ভব হতো না।”
সুমন পারলে, আপনিও পারবেন। শুধু দরকার একটু ধৈর্য এবং সঠিক পদক্ষেপ।
উপসংহার
ব্রেকআপ জীবনের একটি অধ্যায় মাত্র, পুরো বই নয়। কষ্ট হবে, কান্না পাবে—এটা খুব স্বাভাবিক। কিন্তু সেই কষ্টের সাগরে ডুবে যাওয়া যাবে না। উপরে উল্লেখিত ৭টি ভুল এড়িয়ে চললে আপনি দেখবেন, খুব দ্রুতই আপনি আবার হাসতে পারছেন, জীবনকে নতুন করে ভালোবাসতে পারছেন।
মনে রাখবেন, “Every exit is an entry somewhere else.” একজন ভুল মানুষের চলে যাওয়া মানেই হলো একজন সঠিক মানুষের আসার জায়গা তৈরি হওয়া। নিজেকে সময় দিন, নিজের যত্ন নিন। আপনি অনেক মূল্যবান, এবং আপনার জন্য সামনে সুন্দর কিছু অপেক্ষা করছে। ❤️
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
১. ব্রেকআপের পর মুভ অন করতে কতদিন সময় লাগে?
এর কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। গবেষণায় দেখা গেছে, গড়ে ৩ মাস থেকে ১ বছর সময় লাগতে পারে। তবে এটি সম্পূর্ণ নির্ভর করে আপনি নিজেকে কতটা সাহায্য করছেন এবং ‘No Contact Rule’ মানছেন কিনা তার ওপর।
২. আমি কি এক্স-কে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে পারি?
না জানানোই ভালো। বিশেষ করে যদি ব্রেকআপটা নতুন হয়। এটি ‘No Contact Rule’ ভঙ্গ করে এবং আপনার হিলিং প্রসেস ব্যাহত করে। শুভেচ্ছা জানালে আপনি তার উত্তরের অপেক্ষা করবেন, যা আপনাকে আবার হতাশ করতে পারে।
৩. ব্রেকআপের পর কি এক্স-এর সাথে বন্ধু থাকা সম্ভব?
তাৎক্ষণিকভাবে সম্ভব নয়। দুইজনেই যখন পুরোপুরি মুভ অন করবেন এবং কারো মনেই কোনো রোমান্টিক ফিলিংস বা ক্ষোভ থাকবে না (যা হতে বছর লাগতে পারে), তখন বন্ধুত্বের কথা ভাবা যেতে পারে। কিন্তু এখনই নয়।
৪. তাকে ভুলতে পারছি না কেন?
কারণ আপনার ব্রেন আসক্ত। সময়ের সাথে সাথে এবং নতুন মেমোরি তৈরির মাধ্যমে এই অনুভূতি কমে আসবে। ধৈর্য ধরুন, এটা একটা প্রসেস।
৫. সে কি আমাকে মিস করে?
সম্ভবত করে। কিন্তু মনে রাখবেন, মিস করা মানেই ফিরে আসা নয়। যদি সে যোগাযোগ না করে, তার মানে সে মুভ অন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আপনারও সেটাই করা উচিত।
৬. রিবাউন্ড রিলেশনশিপ কি কখনো টেকে?
বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই টেকে না। কারণ এগুলোর ভিত্তি হয় ‘কষ্ট ভোলানো’, ‘ভালোবাসা’ নয়। তবে ব্যতিক্রম হতে পারে, কিন্তু ঝুঁকি না নেওয়াই ভালো।
৭. কান্না কি দুর্বলতা?
একেবারেই না। কান্না হলো ইমোশনাল রিলিজ। এটি আপনাকে মানসিকভাবে হালকা হতে সাহায্য করে। কান্না চেপে রাখাই বরং ক্ষতিকর।
৮. তাকে ব্লক করা কি ইমম্যাচিউর (Immature) কাজ?
না। নিজের মানসিক শান্তির জন্য কাউকে ব্লক করা হলো ‘সেলফ-কেয়ার’ বা নিজের যত্ন নেওয়া। এটি ইমম্যাচিউরিটি নয়, বরং নিজেকে রক্ষা করার একটি উপায়।
৯. ব্রেকআপের পর খাওয়া-দাওয়ায় অরুচি হলে কী করবো?
এটা স্বাভাবিক। জোর করে অল্প অল্প করে পুষ্টিকর খাবার খান। লিকুইড ডায়েট (জুস, স্যুপ) বাড়ান। শরীর দুর্বল হলে মনও দুর্বল হয়ে পড়ে, তাই শরীর ঠিক রাখা জরুরি।
১০. একাকিত্ব কাটাতে কী করবো?
বই পড়ুন, ভালো মুভি দেখুন, শখের কাজ (গার্ডেনিং, পেইন্টিং) করুন অথবা ভলান্টিয়ারিং বা সমাজসেবামূলক কাজে যুক্ত হোন। নিজেকে ব্যস্ত রাখা সেরা ওষুধ।
