ইতিহাসের সবচেয়ে অদ্ভুত ১৫টি ঘটনা যা আপনাকে অবাক করবে

ইতিহাস বলতেই আমরা সাধারণত যুদ্ধ, রাজা-বাদশা আর সাল-তারিখের শুকনো সব তথ্য বুঝি। কিন্তু ইতিহাস কেবল সিরিয়াস ঘটনার সংকলন নয়; এর পাতায় পাতায় এমন সব অদ্ভুত, অবিশ্বাস্য এবং রহস্যময় ঘটনা ছড়িয়ে আছে, যা শুনলে আপনি থমকে যেতে বাধ্য।

আপনি হয়তো আপনার দিনের শুরুটা করেন এক কাপ গরম চা বা কফি দিয়ে, আর ভাবেন দিনটা আর দশটা দিনের মতোই সাধারণ। কিন্তু ইতিহাস আমাদের দেখায় যে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়।

এই আর্টিকেলে আমরা ইতিহাসের সেই সব অদ্ভুত ১৫টি ঘটনা নিয়ে কথা বলবো, যা কোনো সায়েন্স ফিকশন বা ফ্যান্টাসি উপন্যাসের চেয়েও বেশি অবিশ্বাস্য। চলুন, টাইম মেশিনে চড়ে বসি আর ইতিহাসের আজব গলিতে হারিয়ে যাই!

সূচিপত্র (Table of Contents)

১. ১৫১৮ সালের ডান্সিং প্লেগ (The Dancing Plague of 1518)

ভাবুন তো, আপনি একদিন রাস্তা দিয়ে হাঁটছেন আর দেখলেন কিছু লোক উন্মত্তের মতো নাচছে। শুধু তাই নয়, তারা থামছেই না! ১৫১৮ সালে ফ্রান্সের স্ট্রাসবুর্গ শহরে ঠিক এমনটাই ঘটেছিল।

ফ্রাউ ট্রোফিয়া নামের এক মহিলা হঠাৎ করেই রাস্তায় নাচতে শুরু করেন। কোনো কারণ ছাড়াই তিনি টানা চার থেকে ছয় দিন নাচতে থাকেন। এক সপ্তাহের মধ্যে আরও ৩৪ জন তার সাথে যোগ দেয়। এক মাসের মধ্যে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ৪০০!

এই লোকগুলো কোনো উৎসবের জন্য নাচছিল না। তারা যেন কোনো এক অদৃশ্য শক্তির দ্বারা নাচতে বাধ্য হয়েছিল। দিনের পর দিন বিশ্রাম, খাবার বা পানি ছাড়াই তারা নাচতে থাকে। ফলে অনেকেই হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক এবং চরম ক্লান্তিতে মারা যেতে শুরু করে।

কেন এই অদ্ভুত ঘটনা?

তৎকালীন ডাক্তাররা এর কোনো ব্যাখ্যা খুঁজে পাননি। তারা একে “গরম রক্ত” জনিত রোগ বলে আখ্যা দেন। আধুনিক বিজ্ঞানীরা মনে করেন এটি ছিল ‘মাস সাইকোজেনিক ইলনেস’ বা গণ হিস্টিরিয়ার একটি চরম উদাহরণ। সম্ভবত তখনকার সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপের কারণেই মানুষের মধ্যে এই অদ্ভুত মানসিক বিকার দেখা দিয়েছিল।

২. দ্য গ্রেট ইমু ওয়ার (The Great Emu War, 1932)

ইতিহাসে মানুষ অনেক পশুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার এই ঘটনাটি সত্যিই হাস্যকর। ১৯৩২ সালে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ফেরত সৈনিকদের পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ায় চাষাবাদের জন্য জমি দেওয়া হয়। কিন্তু তাদের ফসল ফলাতে গিয়ে এক বিশাল বাধার মুখে পড়তে হয়—প্রায় ২০,০০০ ইমু পাখি!

ইমুরা এই খামারগুলোকে নিজেদের চারণভূমি ভেবে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি করতে শুরু করে। কৃষকরা সরকারের কাছে সাহায্য চায়। সরকারও অদ্ভুত এক সিদ্ধান্ত নেয়। তারা মেজর মেরেডিথের নেতৃত্বে রয়্যাল অস্ট্রেলিয়ান আর্টিলারির একটি দল পাঠায় মেশিনগান সহ!

যুদ্ধের ফলাফল কী ছিল?

বলা বাহুল্য, মানুষ এই যুদ্ধে শোচনীয়ভাবে হেরে যায়। ইমুগুলো ছিল খুবই ধূর্ত এবং দ্রুতগামী। মেশিনগানের গুলির মুখেও তারা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে পালিয়ে যেত। এক মাসব্যাপী এই ‘যুদ্ধের’ পর দেখা গেল, হাজার হাজার গুলি খরচ হলেও মাত্র গুটিকয়েক ইমু মারা পড়েছে। অন্যদিকে ইমুদের আক্রমণে ফসলের ক্ষতি বেড়েই চলেছিল। অবশেষে, অস্ট্রেলিয়ান সেনাবাহিনী এই অসম্মানজনক যুদ্ধ থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়।

৩. তুঙ্গুস্কা ইভেন্ট (The Tunguska Event, 1908)

১৯০৮ সালের ৩০ জুন, সাইবেরিয়ার তুঙ্গুস্কা নদীর কাছে আকাশে এক বিশাল বিস্ফোরণ ঘটে। এর শক্তি ছিল হিরোশিমায় ফেলা পারমাণবিক বোমার চেয়ে প্রায় ১০০০ গুণ বেশি!

এই বিস্ফোরণে প্রায় ২,১৫০ বর্গ কিলোমিটার (প্রায় ৮ কোটি গাছ) বনভূমি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। এর তীব্রতা এতই বেশি ছিল যে শত শত কিলোমিটার দূরের বাড়িঘরের জানালা ভেঙে গিয়েছিল এবং মানুষজন শক ওয়েভে ছিটকে পড়েছিল। মজার ব্যাপার হলো, এত বড় বিস্ফোরণের পরও ঘটনাস্থলে কোনো ইমপ্যাক্ট ক্রেটার বা গর্ত খুঁজে পাওয়া যায়নি।

কী ছিল এই বিস্ফোরণের কারণ?

বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এটি ছিল একটি উল্কা বা ধূমকেতুর অংশ, যা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের পর মাটি স্পর্শ করার আগেই (প্রায় ৫-১০ কিমি উপরে) বিস্ফোরিত হয়েছিল। একে ‘এয়ার বার্স্ট’ বলা হয়। এটি ইতিহাসের রেকর্ড করা সবচেয়ে বড় ‘ইমপ্যাক্ট ইভেন্ট’।

৪. ডায়াটলভ পাস ট্র্যাজেডি (The Dyatlov Pass Incident, 1959)

এটি ইতিহাসের অন্যতম শীতল এবং অমীমাংসিত রহস্য। ১৯৫৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে, রাশিয়ার ইউরাল পর্বতে ইগর ডায়াটলভের নেতৃত্বে ৯ জন অভিজ্ঞ হাইকার ট্রেকিংয়ে যান। কিন্তু তারা আর ফিরে আসেননি।

কয়েক সপ্তাহ পর যখন উদ্ধারকারী দল তাদের ক্যাম্পে পৌঁছায়, তখন তারা এক ভয়াবহ দৃশ্য দেখতে পায়। তাদের তাঁবুটি ভেতর থেকে কেটে ফেলা হয়েছিল। হাইকাররা প্রচণ্ড ঠাণ্ডার মধ্যে (তখন তাপমাত্রা ছিল -৩০°C) খালি পায়ে বা সামান্য পোশাকে তাঁবু থেকে পালিয়ে গিয়েছিল।

মৃত্যুর ধরন ছিল অবিশ্বাস্য:

  • প্রথম পাঁচজনের মৃতদেহ পাওয়া যায় তাঁবু থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে, প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় জমে যাওয়া অবস্থায়।
  • বাকি চারজনের মৃতদেহ দুই মাস পর বরফের নিচ থেকে উদ্ধার করা হয়। তাদের শরীরে ভয়াবহ আঘাতের চিহ্ন ছিল। একজনের মাথার খুলি ভাঙা ছিল, দুজনের পাঁজরের হাড় এমনভাবে ভাঙা ছিল যা কেবল একটি মারাত্মক গাড়ি দুর্ঘটনার সাথেই তুলনা করা চলে। আশ্চর্যজনকভাবে, তাদের শরীরে বাইরের কোনো আঘাতের চিহ্ন ছিল না!
  • এক নারী হাইকারের জিহ্বা এবং চোখ অনুপস্থিত ছিল।
  • কিছু পোশাকে উচ্চ মাত্রার তেজস্ক্রিয়তার উপস্থিতি পাওয়া গিয়েছিল।

এই ঘটনার কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা আজও মেলেনি। তুষারধস, সামরিক পরীক্ষা, এলিয়েন নাকি অন্যকিছু—রহস্য আজও অটুট।

৫. রোয়ানোকে কলোনির রহস্য (The Mystery of the Roanoke Colony, 1590)

আমেরিকায় ইংরেজদের প্রথম বসতি স্থাপনের চেষ্টাগুলোর মধ্যে রোয়ানোকে কলোনি অন্যতম। ১৫৮৭ সালে, জন হোয়াইটের নেতৃত্বে ১১৫ জন উপনিবেশকারী (নারী, পুরুষ ও শিশু সহ) উত্তর ক্যারোলিনার রোয়ানোকে দ্বীপে বসতি স্থাপন করে।

খাদ্য ও রসদের অভাব দেখা দিলে, জন হোয়াইটকে ইংল্যান্ডে ফিরে যেতে হয়। স্পেনের সাথে ইংল্যান্ডের যুদ্ধের কারণে তিনি তিন বছর আটকে পড়েন। ১৫৯০ সালে যখন তিনি রোয়ানোকে ফিরে আসেন, তখন তিনি দ্বীপটিকে সম্পূর্ণ জনশূন্য দেখতে পান।

পুরো কলোনিটি যেন বাতাসে মিলিয়ে গিয়েছিল। সেখানে কোনো লড়াইয়ের চিহ্ন ছিল না, কোনো মৃতদেহ ছিল না। ১১৫ জন মানুষের ভাগ্যে কী ঘটেছিল, তার কোনো ক্লুই ছিল না। শুধু একটি গাছে খোদাই করা ছিল একটি শব্দ— “CROATOAN” ।

কী বোঝাতে চেয়েছিল এই শব্দ?

“Croatoan” ছিল পাশের একটি দ্বীপের নাম এবং সেখানে বসবাসকারী আদিবাসী আমেরিকান উপজাতির নাম। হোয়াইট ভেবেছিলেন হয়তো তারা সেখানে চলে গেছে, কিন্তু তিনি ঝড়ের কারণে সেখানে যেতে পারেননি। আজও জানা যায়নি সেই ১১৫ জন মানুষ স্বেচ্ছায় চলে গিয়েছিল, আদিবাসীদের সাথে মিশে গিয়েছিল, নাকি তাদের হত্যা করা হয়েছিল।

৬. লন্ডন বিয়ার ফ্লাড (The London Beer Flood, 1814)

বন্যা সাধারণত পানির হয়, কিন্তু ১৮১৪ সালে লন্ডনের সেন্ট জাইলস এলাকায় যা ঘটেছিল তা ছিল বিয়ারের বন্যা! ‘মিউক্স অ্যান্ড কোম্পানি’ নামক এক ব্রিউয়ারিতে (মদ তৈরির কারখানা) একটি বিশাল কাঠের ভ্যাট বা চৌবাচ্চা ফেটে যায়।

এই ভ্যাটটিতে প্রায় ৬ লক্ষ ১০ হাজার লিটার (১ লক্ষ ৩৫ হাজার গ্যালন) বিয়ার ছিল। এর চাপে পাশের অন্যান্য ভ্যাটগুলোও ভেঙে যায়। মুহূর্তের মধ্যে প্রায় ১৫ লক্ষ লিটার বিয়ারের এক বিধ্বংসী ঢেউ রাস্তায় নেমে আসে।

বিয়ারের এই ১৫ ফুট উঁচু ঢেউ আশেপাশের বস্তি এলাকা ধ্বংস করে দেয়। এই ঘটনায় ৮ জন মানুষ মারা যায়; কেউ কেউ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে, আবার কেউ কেউ বিয়ারে ডুবে। এটি ছিল এক মর্মান্তিক এবং অদ্ভুত দুর্ঘটনা।

৭. বোস্টন মোলাসেস ফ্লাড (The Boston Molasses Flood, 1919)

লন্ডন বিয়ার ফ্লাডের মতোই আরেকটি আঠালো ও ভয়াবহ ঘটনা। ১৯১৯ সালের ১৫ জানুয়ারি, বোস্টন শহরে একটি বিশাল স্টোরেজ ট্যাঙ্কে (যা দিয়ে মূলত শিল্পক্ষেত্রে অ্যালকোহল বানানো হতো) প্রায় ২.৩ মিলিয়ন গ্যালন গুড় বা মোলাসেস রাখা ছিল।

ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় হঠাৎ করেই ট্যাঙ্কটি ফেটে যায়। প্রায় ২৫ ফুট উঁচু একটি আঠালো গুড়ের ঢেউ ঘণ্টায় ৩৫ মাইল বেগে শহরের রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ে। এই আঠালো সুনামিতে ২১ জন মানুষ নিহত হয় এবং ১৫০ জনেরও বেশি আহত হয়। গুড়ের এই স্রোত এতটাই শক্তিশালী ছিল যে এটি ভবন ধসিয়ে দেয় এবং একটি ট্রেনকে লাইনচ্যুত করে। শহর পরিষ্কার করতে সপ্তাহ লেগে গিয়েছিল।

৮. ট্যারারে: যে ব্যক্তি সব খেতে পারতো (Tarrare: 18th Century France)

ট্যারারে ছিলেন অষ্টাদশ শতাব্দীর ফ্রান্সের এক ব্যক্তি, যার ক্ষুধা ছিল আক্ষরিক অর্থেই অতৃপ্ত। তিনি অবিশ্বাস্য পরিমাণে খাবার খেতে পারতেন। কিশোর বয়সেই তিনি তার নিজের ওজনের সমান মাংস একদিনে খেতে পারতেন।

তার বাবা-মা তার খরচ চালাতে না পেরে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেন। এরপর তিনি ভ্রাম্যমাণ সার্কাসে যোগ দেন, যেখানে তিনি পাথর, কর্ক, জীবন্ত বিড়াল, কুকুরছানা এবং সাপ গিলে খেয়ে দর্শকদের বিনোদন দিতেন।

সেনাবাহিনীতে ট্যারারে

ফরাসি বিপ্লবী সেনাবাহিনী তাকে গুপ্তচর হিসেবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করে। তার পরিকল্পনা ছিল, তিনি একটি কাঠের বাক্সে বার্তা গিলে খাবেন, শত্রু সীমানা পার হয়ে টয়লেটে গিয়ে সেই বার্তা বের করবেন। কিন্তু তার অদ্ভুত আচরণ এবং অসহ্য শারীরিক দুর্গন্ধের কারণে তিনি সহজেই ধরা পড়ে যান। এমনকি তিনি হাসপাতালের মর্গে ঢুকে মৃতদেহ খাওয়ার চেষ্টাও করেছিলেন বলে অভিযোগ আছে। তার এই অবস্থার কোনো চিকিৎসা করা যায়নি এবং তিনি ২৬ বছর বয়সে যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

৯. ভয়নিচ ম্যানুস্ক্রিপ্ট (The Voynich Manuscript)

এটি হলো পৃথিবীর সবচেয়ে রহস্যময় বই। কার্বন ডেটিং অনুসারে, এটি ১৫ শতকের প্রথম দিকে লেখা হয়েছিল। কিন্তু এই বইটির লেখক কে, এটি কোন ভাষায় লেখা, বা এর বিষয়বস্তু কী, তা আজ পর্যন্ত কেউ জানতে পারেনি।

বইটির পাতায় পাতায় অদ্ভুত সব উদ্ভিদের ছবি আঁকা আছে, যার কোনোটিই পৃথিবীর পরিচিত কোনো উদ্ভিদের সাথে মেলে না। এতে নগ্ন মহিলাদের ছবি আছে যারা অদ্ভুত সব টিউব বা যন্ত্রের সাথে সংযুক্ত। আরও আছে জটিল জ্যোতির্বিদ্যার চার্ট যা বোঝা সম্ভব হয়নি।

কেন এটি এত রহস্যময়?

বইটির ভাষা বা কোডটি সম্পূর্ণ অজানা। বিশ্বের সেরা ক্রিপ্টোগ্রাফার এবং কোডব্রেকাররা (এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কোড ব্রেকাররাও) এটি ভাঙতে ব্যর্থ হয়েছেন। এটি কি কোনো ভিনগ্রহের ভাষা? কোনো প্রাচীন হারানো সভ্যতা? নাকি পুরোটাই এক জটিল ধাপ্পাবাজি? উত্তর আজও অজানা।

১০. মেরি সেলেস্ট: ভুতুড়ে জাহাজ (The Mary Celeste, 1872)

১৮৭২ সালের ডিসেম্বরে, আটলান্টিক মহাসাগরে ‘মেরি সেলেস্ট’ নামের একটি জাহাজকে উদ্দেশ্যহীনভাবে ভাসতে দেখা যায়। জাহাজটি যখন উদ্ধার করা হয়, তখন সেটি ছিল সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত।

আশ্চর্যজনকভাবে, জাহাজটি সম্পূর্ণ অক্ষত ছিল। এর মালপত্র (প্রায় ১৭০০ ব্যারেল অ্যালকোহল) ঠিকঠাক ছিল। জাহাজে ৬ মাসের খাবার ও পানি মজুত ছিল। ক্যাপ্টেন বেঞ্জামিন ব্রিগস, তার স্ত্রী, শিশু কন্যা এবং ৭ জন ক্রু—মোট ১০ জন মানুষের কোনো চিহ্নই ছিল না। জাহাজের লাইফবোটটি নিখোঁজ ছিল।

এই রহস্য সমাধান করা চা বনাম কফির বিতর্ক এর চেয়েও জটিল। তারা কেন একটি সম্পূর্ণ ভালো জাহাজ ছেড়ে লাইফবোটে করে উত্তাল সমুদ্রে নেমে পড়লেন? জলদস্যুর আক্রমণ, সামুদ্রিক দানব, নাকি ক্রুদের বিদ্রোহ—কোনো কিছুরই শক্ত প্রমাণ মেলেনি। ‘মেরি সেলেস্ট’ আজও সামুদ্রিক রহস্যের সেরা উদাহরণ হয়ে আছে।

১১. দ্য ক্যারিংটন ইভেন্ট (The Carrington Event, 1859)

১৮৫৯ সালে ঘটে যাওয়া ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী সৌরঝড়। ব্রিটিশ জ্যোতির্বিদ রিচার্ড ক্যারিংটন এই ঝড়ের মূল সোলার ফ্লেয়ারটি পর্যবেক্ষণ করেন।

এই সৌরঝড়ের প্রভাবে পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রে বিশাল আলোড়ন সৃষ্টি হয়। এর ফলাফল ছিল নাটকীয়। সারা বিশ্বে টেলিগ্রাফ সিস্টেম ভেঙে পড়ে। টেলিগ্রাফ অপারেটররা বৈদ্যুতিক শক খান এবং অনেক জায়গায় টেলিগ্রাফ মেশিন থেকে কাগজপত্রে আগুন ধরে যায়।

আকাশে অদ্ভুত আলো

অরোরা বা মেরুজ্যোতি (যা সাধারণত শুধু মেরু অঞ্চলে দেখা যায়) এত তীব্র ছিল যে কিউবা এবং হাওয়াইয়ের মতো গ্রীষ্মমণ্ডলীয় এলাকা থেকেও তা দেখা গিয়েছিল। আমেরিকার রকি মাউন্টেনে সোনা অনুসন্ধানকারীরা মাঝরাতে ঘুম থেকে জেগে ওঠে ভেবেছিল সকাল হয়ে গেছে, কারণ অরোরার আলো এতটাই উজ্জ্বল ছিল! যদি এমন একটি সৌরঝড় আজ পৃথিবীতে আঘাত হানে, তবে তা আমাদের আধুনিক প্রযুক্তি, জিপিএস, ইন্টারনেট এবং পাওয়ার গ্রিডকে মুহূর্তের মধ্যে অচল করে দিতে পারে।

১২. ১৯০৪ সালের অলিম্পিক ম্যারাথন (The 1904 Olympic Marathon)

সেন্ট লুইস অলিম্পিকের এই ম্যারাথনটিকে ইতিহাসের সবচেয়ে বিশৃঙ্খল এবং অদ্ভুত দৌড় প্রতিযোগিতা বলা হয়।

  • বিজয়ী (যিনি তা নন): ফ্রেড লর্জ প্রথম স্থান অধিকার করেন। কিন্তু পরে জানা যায়, তিনি ৯ মাইল দৌড়ানোর পর ক্লান্ত হয়ে একটি গাড়িতে চড়ে বসেন এবং ফিনিশ লাইনের কিছু আগে গাড়ি থেকে নেমে দৌড়ে প্রথম হন! তিনি ধরা পড়েন এবং আজীবন নিষিদ্ধ হন।
  • আসল বিজয়ী: টমাস হিকস দ্বিতীয় স্থানে থেকে দৌড় শেষ করেন (পরে তাকেই বিজয়ী ঘোষণা করা হয়)। কিন্তু তিনিও প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছিলেন। দৌড়ের সময় তার ট্রেইনাররা তাকে ‘স্ট্রিকনিন’ (ইঁদুর মারার বিষ, যা অল্প মাত্রায় উদ্দীপক হিসেবে কাজ করে) এবং ব্র্যান্ডি (মদ) খাইয়েছিলেন। ফিনিশ লাইনে পৌঁছানোর পর তিনি প্রায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিলেন।
  • অন্যান্য প্রতিযোগী: চতুর্থ স্থান অধিকারী কিউবান প্রতিযোগী ফেলিক্স কারভাজাল দৌড়ের মাঝে থেমে একটি ফলের বাগানে ঢুকে পচা আপেল খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। দক্ষিণ আফ্রিকার দুই প্রতিযোগী জোহানেসবার্গের হিংস্র কুকুরের তাড়া খেয়ে মাঠ থেকে ছিটকে পড়েন।
  • আয়োজন: আয়োজকরা মাত্র একটি জায়গায় পানির ব্যবস্থা রেখেছিলেন, কারণ তারা দেখতে চেয়েছিলেন ‘ডিহাইড্রেশনের’ প্রভাব কেমন হয়!

১৩. বিপথগামী কুকুরের যুদ্ধ (The War of the Stray Dog, 1925)

দুটি দেশের মধ্যে যুদ্ধের জন্য কতটুকুই বা কারণ লাগে? ১৯২৫ সালে গ্রিস এবং বুলগেরিয়ার মধ্যে সম্পর্ক খুবই উত্তপ্ত ছিল। এমন অবস্থায় সীমান্তে ঘটে এক অদ্ভুত ঘটনা।

এক গ্রিক সৈন্যের পোষা কুকুর সীমান্ত পেরিয়ে বুলগেরিয়ার দিকে চলে যায়। সৈন্যটি তার কুকুরকে ফিরিয়ে আনতে সীমান্ত পার হলে বুলগেরিয়ান সীমান্তরক্ষীরা তাকে গুলি করে হত্যা করে।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে গ্রিস ক্ষুব্ধ হয় এবং বুলগেরিয়ার ওপর আক্রমণ চালায়। তারা সীমান্ত শহর পেট্রিচ দখল করে নেয়। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয় যে একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের আশঙ্কা দেখা দেয়। অবশেষে, ‘লীগ অফ নেশনস’ (জাতিসংঘের পূর্বসূরি) হস্তক্ষেপ করে এবং গ্রিসকে সেনা প্রত্যাহারের নির্দেশ দেয়। একটি কুকুরের জন্য শুরু হওয়া এই সংক্ষিপ্ত যুদ্ধটি ‘War of theS tray Dog’ নামে পরিচিতি পায়।

১৪. টাঙ্গানিকার হাসির মহামারী (The Tanganyika Laughter Epidemic, 1962)

১৯৬২ সালে, টাঙ্গানিকায় (বর্তমানে তানজানিয়া) একটি বোর্ডিং স্কুলে এই অদ্ভুত মহামারীর শুরু। তিনজন ছাত্রী কোনো এক অজানা কারণে হাসতে শুরু করে। কিন্তু সেই হাসি আর থামে না।

এই হাসি দ্রুত স্কুলের অন্যান্য ছাত্রীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। দেখতে দেখতে ৯৫ জন ছাত্রী এই হাসির কবলে পড়ে। তারা কোনো কারণ ছাড়াই ঘণ্টার পর ঘণ্টা, এমনকি দিনের পর দিন হাসতে থাকে। পরিস্থিতি এতটাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় যে স্কুলটি বন্ধ ঘোষণা করতে হয়।

হাসি যখন সংক্রামক

ছাত্রীরা বাড়ি ফিরে গেলে, এই ‘হাসির মহামারী’ তাদের গ্রামে এবং আশেপাশের অন্যান্য গ্রামেও ছড়িয়ে পড়ে। সব মিলিয়ে প্রায় ১৪টি স্কুল বন্ধ করতে হয়েছিল এবং হাজারেরও বেশি মানুষ এতে আক্রান্ত হয়েছিল। এই হিস্টিরিয়াটি প্রায় ১৮ মাস ধরে চলেছিল। এটিও ছিল ‘মাস সাইকোজেনিক ইলনেস’-এর একটি চরম নিদর্শন।

১৫. “ওয়াও!” সিগন্যাল (The “Wow!” Signal, 1977)

১৯৭৭ সালের ১৫ আগস্ট, জ্যোতির্বিজ্ঞানী জেরি এহম্যান ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটির ‘বিগ ইয়ার’ রেডিও টেলিস্কোপে কাজ করছিলেন। তিনি মহাকাশ থেকে আসা সংকেত পর্যবেক্ষণ করছিলেন।

হঠাৎ করেই টেলিস্কোপটি ধনু রাশির (Sagittarius) দিক থেকে আসা একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং অস্বাভাবিক ন্যারো-ব্যান্ড রেডিও সংকেত গ্রহণ করে। সংকেতটি ৭২ সেকেন্ড স্থায়ী ছিল। এটি ছিল ঠিক সেই রকম সংকেত, যা বিজ্ঞানীরা ভিনগ্রহের বুদ্ধিমান প্রাণী বা এলিয়েনদের কাছ থেকে আশা করেন।

জেরি এহম্যান ডেটা প্রিন্টআউটে সংকেতটি দেখে এতটাই উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলেন যে তিনি তার পাশে লাল কালিতে “Wow!” লিখে রাখেন। সেই থেকেই এর নাম “ওয়াও! সিগন্যাল”। দুঃখের বিষয়, সেদিনর পর থেকে বহু চেষ্টা করেও সেই একই জায়গা থেকে ওই সংকেত আর কখনোই পাওয়া যায়নি। এটি কি এলিয়েনদের পাঠানো কোনো বার্তা ছিল? নাকি মহাজাগতিক কোনো অজানা ঘটনা?

শেষ কথা

ইতিহাসের এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে আমাদের পৃথিবীটা সত্যিই অদ্ভুত এবং রহস্যময়। যুদ্ধ, মহামারী আর বিপ্লবের বাইরেও এমন সব ঘটনা ঘটেছে যা আমাদের কল্পনাকেও হার মানায়। এই ১৫টি ঘটনা সেই বিশাল রহস্যের সাগরের এক বিন্দু জল মাত্র। ইতিহাস সবসময়ই আমাদের অবাক করার জন্য নতুন নতুন বিস্ময় নিয়ে অপেক্ষা করছে।

জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

প্রশ্ন: এই ঘটনাগুলোর মধ্যে কোনটি সবচেয়ে অদ্ভুত?

উত্তর: এটি বলা কঠিন, কারণ প্রতিটি ঘটনাই নিজ নিজ ক্ষেত্রে অদ্ভুত। তবে ‘ডায়াটলভ পাস ট্র্যাজেডি’ তার অমীমাংসিত রহস্যের জন্য এবং ‘ডান্সিং প্লেগ’ তার উদ্ভট আচরণের জন্য তালিকার শীর্ষে থাকতে পারে।

প্রশ্ন: এই সব ঘটনাই কি সত্যি?

উত্তর: হ্যাঁ, এই আর্টিকেলে উল্লিখিত সমস্ত ঘটনাই ঐতিহাসিকভাবে নথিভুক্ত (documented)। কিছু ঘটনার (যেমন ডায়াটলভ পাস বা রোয়ানোকে) সব বিবরণ বা কারণ জানা যায়নি, তবে ঘটনাগুলো যে ঘটেছিল সে সম্পর্কে ঐতিহাসিক প্রমাণ রয়েছে।

প্রশ্ন: ‘মাস সাইকোজেনিক ইলনেস’ বা গণ হিস্টিরিয়া কী?

উত্তর: এটি এমন একটি মানসিক অবস্থা যেখানে কোনো নির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই একটি দলের বা সম্প্রদায়ের অনেক মানুষ একইসাথে শারীরিক বা মানসিক উপসর্গে (যেমন হাসি, কান্না, খিঁচুনি বা অসুস্থতা) আক্রান্ত হয়। ডান্সিং প্লেগ এবং টাঙ্গানিকার হাসির মহামারী এর উদাহরণ।

প্রশ্ন: ইতিহাসের এই অদ্ভুত ঘটনাগুলো কি বিজ্ঞান দ্বারা ব্যাখ্যা করা সম্ভব?

উত্তর: বেশিরভাগ ঘটনারই বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যা আছে, যেমন ডান্সING প্লেগকে মাস সাইকোজেনিক ইলনেস বলা হয়। তবে কিছু ঘটনা যেমন ডায়াটলভ পাস বা রোয়ানোকে কলোনির রহস্য আজও ব্যাখ্যাতীত। বিজ্ঞানীরা এখনও গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন।

প্রশ্ন: এই ধরনের অদ্ভুত ঘটনা কি আজকের দিনেও ঘটতে পারে?

উত্তর: হ্যাঁ, আজও বিশ্বজুড়ে অদ্ভুত ও রহস্যময় ঘটনা ঘটে চলেছে। তবে বর্তমানে আমরা বেশি সচেতন এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি থাকায় অনেক ঘটনারই ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া যায়। তবুও প্রকৃতি ও মানুষের মন এখনও অনেক রহস্যে ঘেরা।

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।